সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই

জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ

বিএস ডেস্ক:৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন।  ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজে জানানো হয়েছে সকাল ছয়টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন:
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ই আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার, মা তৈয়বা মজুমদার। খালেদা জিয়ার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে দেশ ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তাঁর আদি বাড়ি ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা (প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ও বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা) জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর ১৯৮২ সালের ২রা জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন খালেদা জিয়া। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি এরশাদের স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালের কারচুপির নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যদিও আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন শাসনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়। খালেদা জিয়ার দৃঢ়তার কারণে, তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয়েছিল। তিনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে শক্তিশালী একটি সংগঠনে পরিণত করেন যার ফলে তারা সারা দেশে ৩২১টি ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে ২৭০টিতে জয়লাভ করে। এই ছাত্ররা ১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।

১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করেন। খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়। ২০০৬ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন সেনা শাসিত সরকার গ্রেপ্তার করে। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। নেতৃত্ব দেন বিরোধীদের আন্দোলনে। ২০১৮ সালে কথিত দুর্নীতির মামলায় তাকে কারাগারে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় তাকে শর্ত সাপেক্ষে বাসায় থাকার অনুমতি দেয় সরকার। কারাগারে থাকার সময়ে তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়। বাসায় ফিরলেও তিনি আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার প্রয়োজন হলেও সরকার সে অনুমতি দেয়নি। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেয়া হয়। সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরে আসলেও সময়ে সময়ে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। সর্বশেষ ২৩শে নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা “উপবৃত্তি” এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিলেন। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করে। রাজনৈতিক জীবনে বেগম জিয়া যতো আসনে নির্বাচন করেছেন তার কোনোটিতেই পরাজিত হননি। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সেখানে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯%। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন।
তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে। ১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অনলাইন পোর্টাল দৈনিক ভোলাহাট সংবাদ ও সাপ্তাহিক ভোলাহাট সংবাদ পরিবার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে। আমরা ভোলাহাট সংবাদ পরিবার শোকাহত। – সংগ্রহকৃত( দৈনিক মানবজমিন)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *