শেষ জীবনে অসহায় ফেরিওয়ালা রশিদ প্রামাণিক 

জাতীয় সারা দেশ

গোলাম কবির: ছোট শিশুদের বই কাঁধে করে কখনো ট্রেনে কখনো বাজারে কখনো লঞ্চে কখনো রাস্তায় চলতে চলতে বয়সের ভার আর নানা রোগের বাসা বেঁধেছে শরীরে। বেঁচে থাকার তাগিদে এভাবেই ৪৮ বছর পার করলেন আব্দুর রশিদ প্রামাণিক। এক সময়‌ যৌবন যৌলুস শক্তি সামর্থ্য স্ত্রী সন্তান বাড়ি ঘর সব ছিল। এখন বাড়ি ঘর স্ত্রী সন্তান কেউ নেই। শরীরে শক্তি নেই। নানা রোগে বাসা বাঁধেছে । ঔষধ কেনার পয়সা জুটে না। পরনে ময়লা একটি মাত্র লুঙ্গি আর শার্ট সেই কবেকার। সারাদিন ট্রেনে বা রাস্তা ঘাট, বাজারে বই বিক্রি করে। পুঁজি বাদে আয় হয় ২০/৩০ টাকা। অসুস্থ হলে আয় বন্ধ। না খেয়েই পড়ে থাকতে হয় যত্রতত্র। একমাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা আব্দুর রশিদের। কাঁকনহাট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠার পূর্ব মুহূর্তে ক্লান্ত অসুস্থ দেহ হাতের বাম পাশে একটি কাপড়ের ব্যাগের ভেতর ও উপরে রয়েছে কয়েকটি বই। কাঁধে তুলে ট্রেনে উঠবেন বিক্রির জন্য।  ট্রেনের  অপেক্ষা করছেন ভিঠে মাটি স্ত্রী সন্তান হারা রশিদ। চোখে পড়তেই তাঁর কাছে ছুটে গিয়ে সালাম দিয়ে কিছু জানতে চাইলাম। কিছু প্রশ্ন করে আব্দুর রশিদ প্রামাণিকের কাছে তাঁর জীবনের গল্প জানতে চাইলে কোন উত্তর না দিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ দিয়ে দেদারসে গড়িয়ে পড়ছে পানি। কথাই বলতে পারছেন না। এক পর্যায়ে ঢুকরে ঢুকরে কেঁদে কেঁদে শুরু করলেন অনেক কথাই। সবটুকু পাঠককে বলতে না পারলেও সংক্ষিপ্ত গল্প তাঁর মুখ থেকে শুনে নেই। তিনি বলেন, আমার জীবন ঘিরে স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ে সন্তান নিয়ে সাজানো সংসার ছিল। দারিদ্র্যতার কারণে পড়ালেখা তেমন করতে পারিনি। সংসারের হাল ধরতে আজ থেকে ৪৮ বছর পূর্বে শিশুদের বই ক্রয় করে ট্রেনে, হাটে বাজারে, স্টেশনে, পথে ঘাটে, লঞ্চে বিক্রি করে যে আয় করতাম বেশ ভালো চলে যেত। কিন্তু দিন যত যায় ততই কষ্ট আর দুঃখ চারে দিক থেকে ঘিরে ফেলে। দশ বছর হলো স্ত্রী মারা যায়। এক ছেলে এক মেয়ে গার্মেন্টসে চাকরি করে। তারাও এ দূর্দিনে একটা পয়সা দিয়ে সহায়তা করেনা। বসবাস করার মত একটি ঘর নেই। তিন মাস থেকে থাকি কাঁকনহাটের বাজারে। এর পূর্বে থাকতাম রাজশাহীতে। মানুষের দেওয়া টাকায় কয়েকটি বই কিনে বিক্রি করি। বই বিক্রি করে সারা দিনে ২০/৩০ টাকা আয় হয় এতেই খেয়ে না খেয়ে চলে যায়। রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছি। ঔষধ কেনার টাকা জুটাতে পারছিনা। তাঁর সাথে যোগাযোগের জন্য ফোন নাম্বার চাইলে তাঁর কাছে একটি ফোন নেই বলে জানান। বই বিক্রি ছাড়া অন্য পেশায় কেন যাননি প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি শিশুদের খুব ভালোবাসি। তারা ছোট থেকে বিভিন্ন আকর্ষণীয় বই পড়ে বেড়ে উঠবে এমন আনন্দ থেকে এবং ছোট বাচ্চাদের শিক্ষার আলো দেখাতেই আমি এ পেশায় এসেছিলাম। এখন দেখি শিশুদের জন্য অনেক  আধুনিক মানের বই বের হওয়াতে আগের মত আর বই কেউ নিতে চাই না। সব মিলিয়ে আমি এখন জীবন্ত লাশ হয়ে গেছি। আমাকে দেখার মত পৃথিবীতে কেউ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *